বাংলাদেশে মতপ্রকাশ, ধর্মীয় সমালোচনা এবং সহিংসতার শিকার কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশে গত এক দশকে ধর্মীয় উগ্রবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ধর্ম, নাস্তিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা বা ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা নিয়ে লেখালেখি করা কয়েকজন লেখক ও ব্লগার প্রকাশ্যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০১৩ সালে ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দার (থাবা বাবা) ঢাকায় নিজ বাসার কাছে কুপিয়ে হত্যা করা হন। তিনি ধর্মীয় উগ্রবাদের সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে ঢাকার বইমেলা এলাকা থেকে ফেরার পথে সশস্ত্র হামলাকারীরা কুপিয়ে হত্যা করে। তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতর আহত হন। অভিজিৎ রায় বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবতাবাদ এবং ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা নিয়ে লিখতেন। অভিজিৎ রায় হত্যার এক মাসের মধ্যেই ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে ঢাকায় প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় কুসংস্কার ও উগ্রবাদের সমালোচনা করতেন। একই বছরের মে মাসে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস সিলেটে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। তিনি বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও মৌলবাদের বিরোধিতা নিয়ে লিখতেন। ২০১৫ সালের আগস্টে নিলয় নীল (নিলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়) নিজের বাসায় কুপিয়ে হত্যা হন। তিনি ধর্মীয় উগ্রবাদের সমালোচনা এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে লেখালেখি করতেন। এর আগে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ২০১৬ সালে আইন শিক্ষার্থী ও অনলাইন লেখক নাজিমউদ্দিন সামাদকেও হত্যা করা হয়। তিনি সামাজিক মাধ্যমে ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং রাষ্ট্রে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনামূলক মত প্রকাশ করতেন। এসব ঘটনার ফলে বাংলাদেশে বহু লেখক, ব্লগার ও মুক্তচিন্তার মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন অথবা প্রকাশ্যে মত প্রকাশ কমিয়ে দেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বলেছে যে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রক্ষা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা বা ভিন্নমত প্রকাশ করাও একটি নাগরিক অধিকার। কোনো মতের জবাব যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে দেওয়া উচিত; সহিংসতা, হত্যা বা ভয় দেখানো কখনোই মতবিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।